06/11/2022
এক কিশোর মুক্তিযোদ্ধার গল্প : তুহিনের স্বাধীন দেশ
admin admin

মোরশেদ তালুকদার :

১৬ ডিসেম্বর; বাঙালি জাতির বিজয়ের দিন। উৎসবের দিন। আনন্দের দিন। তবে এ বিজয় সহজে অর্জিত হয় নি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া। সন্তান হারানো মা-বাবা, লাখো স্বজন হারানোর চোখের জল লুকিয়ে আছে এর পেছনে।

এদিন দেশজুড়ে বিজয় উৎসব করেন লাখো বাঙালি। ঠিক সেই মুহূর্তে হয়তো ১৯৭১ সালে সন্তানহারা অসংখ্য মা বেদনায় কেঁদে উঠেন। আড়ালে চোখের জল ফেলেন। এমনই একজন মা শাকিলা আহমেদ। তার ছেলে তুহিন। শহীদ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। বিজয় দিবসের সকালে “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলবো না” বেজে উঠলে ব্যাকুল হয়ে উঠেন শাকিলা আহমেদ। কি করে ভুলবেন তিনি তুহিনকে।

তুহিনের গল্প নিয়ে শিশুসাহিত্যিক শুকলাল দাশ এর কিশোর উপন্যাস “তুহিনের স্বাধীন দেশ” এবার বইমেলায় প্রকাশ করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন। বাঙালি জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যময় এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মুক্তিযু্দ্ধের দিনগুলোকে এ কিশোর উপন্যাসে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। এবং সেটা খুব সাবলীল ভাষায়।

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন দেখে মুক্তির স্বপ্ন দেখে কিশোর তুহিন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অংশ নেয়, প্রাণও দেয় দেশের জন্য। মৃত্যুর আগে তার সাহসী উচ্চারণ, “আমি দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি, আমি মৃত্যুকে ভয় পাইনি।” কার্যত এ সংলাপের মধ্য দিয়ে লেখক লাল-সবুজের পতাকার জন্য জীবন দেয়া সমস্ত অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব ও সাহসের সঙ্গে পরিচয় করে দিয়েছেন বর্তমান সময়ের কিশোর-তরুণদের।

২. চৌদ্দ বছরের কিশোর তুহিন। দশম শ্রেণির ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. হামিদের সন্তান। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকার কারণে অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কাছ থেকে দেখছে সে। যা প্রভাবিত করে তাকে। তুহিন জানালার গ্রিল ধরে মিছিলের সারি গুনত আর মুখস্থ করত আগুনঝরা স্লোগান। আর ছুটে যেতে চাইত মিছিলে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় মা শাকিলা আহমেদ। সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত তিনি।

দিন দিন ঢাকার পরিবেশ পাল্টে যাচ্ছে। তাই শঙ্কাটাও বেড়ে যায়। অফিসের কাজে ১০ মার্চ ঢাকায় আসেন তুহিনের খালু। পরদিন তার সঙ্গে তুহিনকে পাঠিয়ে দেয়া হয় চট্টগ্রাম, খালামণির বাসায়। খালাতো ভাই সানি তুহিনের সমবয়সী। তুহিন চট্টগ্রাম আসার কিছুদিন পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা কিছু মুক্তিযোদ্ধা কিশোর-যুবকদের গেরিলা প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ খবর দেয় সানির বন্ধু জয়। তুহিন ও সানি গোপনে অংশ নেয়, শেষ করে ট্রেনিং।

এক অমাবস্যার রাতে পাক সেনাদের আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধারা। তুহিনও সেই দলের সদস্য। সম্মুখযুদ্ধে বুকের বাম পাশে এবং কোমরে গুলি লাগে তুহিনের। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তুহিন। সে রাতের বর্ণনাটা লেখক এভাবেই দিয়েছেন, “রাত তিনটে বাজতেই শোনা গেল শিসের শব্দ, মনে হলো যেন পাখির ডাক। তুহিন, সানি ও জয় তিন দিক থেকেই গ্রেনেডের পিন খুলে খোলা জানালা দিয়ে ছুঁড়ে মারল। একসঙ্গে সবকটা গ্রেনেড বিস্ফোরিত হল। ভেতর থেকে চিৎকার করে পাক সেনারা বেরিয়ে আসতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেল ও গ্রেনেড রাতের নিস্তব্ধতা খান খান করে বারুদের গন্ধে চারদিকের বাতাস ভরিয়ে তুলল। খান সেনারাও পাল্টা গুলি ছুঁড়ে প্রতিরোধ গড়তে চাইল, কিন্তু বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারল না। তিনজনের মৃতদেহ ফেলে রেখে রাতের অন্ধকারে দিশেহারার মতো ক্যাম্প ছেড়ে স্পিডবোটে করে বোয়ালখালীর দিকে পালায় তারা।” পাক সেনারা পালিয়ে যাওয়ার পর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তুহিনকে। কমান্ডার সবুজের নির্দেশে সবাই তুহিনকে খুঁজতে শুরু করে। একটু দূরে ঝোঁপের কাছে তাকে পাওয়া যায়। তার শরীরে মেশিনগানের গুলি লেগেছে। কমান্ডার সবুজ এক মুহূর্তও দেরি না করে তুহিনকে নিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ক্যাম্পে চলে এলেন। তুহিন অস্ফুট স্বরে বলল, সবুজ ভাই, আমি কি মরে যাবো? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। আমি যদি মরে যাই তবে মাকে বলবেন, ‘আমি দেশের জন্যে যুদ্ধ করেছি, আমি মৃত্যুকে ভয় পাইনি। আমার মা হয়তো আপনার কথা বিশ্বাস করবে না। মা ভাববে, আমি এখনো ছোট’।”

৩. মুক্তিযু্দ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস ‘তুহিনের স্বাধীন দেশ’। অবশ্য বাংলা সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় স্থান করে নিয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো উপজীব্য হয়েছে কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং নাটকে। ‘তুহিনের স্বাধীন দেশ’ এ লেখক কেবল গল্প বলেননি। বরং গল্পের আবহে তুলে ধরেছেন এক নিরেট সত্য, বাঙালির বিজয় এসেছে তুহিনের মত লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে। গল্পের ঢংয়ে লেখক একটা সময়কে তুলে এনেছেন সমকালের সামনে। যে সময়টা ছিল বাঙালি জাতির জন্য অনেক অর্থবহ। ৫০ বছর পার হলেও নিখুঁত বর্ণনায় সে সময়টা স্বচ্ছ আয়নার মত ধরা দিবে পাঠকের কাছে। যে আয়নায় ভেসে উঠেবে বাঙালির গৌরব মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ।

পুনশ্চ, এটি কোনো নিখুঁত সাহিত্য সমালোচনা নয়। একজন পাঠকের প্রতিক্রিয়া মাত্র। উল্লেখ্য, ‘তুহিনের স্বাধীন দেশ’ এর লেখক শুকলাল দাশ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র দৈনিক আজাদীর সিনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত। শিশুসাহিত্যিক হিসেবেই খ্যাতি আছে তার। ‘তুহিনের স্বাধীন দেশ’ তার নবম গ্রন্থ।


  • VIA
  • admin
  • TAGS



LEAVE A COMMENT

সোশাল মিডিয়া