হযরত শাহ সুফি মওলানা সৈয়দ জমির উদ্দিন (রহ:)- জীবনী

99

মোঃ নজরুল ইসলাম :

হযরত শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ জমির উদ্দিন ছিলেন একজন কামেল পীর এবং কাশফ ও কারামত সম্পন্ন অলি আল্লাহ। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ বুজুর্গ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার আধার মানিক গ্রামে ১৮৫৭ সালে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতা সৈয়দ আশরাফ শাহ এবং পিতামহ হলেন প্রখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ আহমদ আলী ওরফে সৈয়দ আউলিয়া। আর প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুফি সৈয়দ মারুফ শাহ ও সৈয়দ বখতেয়ার মাহিসাওয়ার এর বংশধর হলেন সৈয়দ আউলিয়া। সৈয়দ জমির উদ্দিন বাল্যকাল থেকে একা থাকতে পছন্দ করতেন এবং কম কথা বলতেন এবং ধর্ম কর্মের প্রতি একান্ত অনুরাগী ছিলেন। তাঁর বয়স চার বছর চার মাস হলে তাঁকে তাঁর বুজুর্গ পিতা কোরআনের সবক দেন এবং তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা পিতা-মাতার তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়। নিজ দেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত শেষে তিনি উচ্চ শিক্ষার জন্য কলকাতায় গমন করেন এবং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে তাফসীর, হাদীস, ফিকাহ প্রভৃতি শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য হাসিল করেন। পরিশেষে ভারতের ইউপি রাজ্যের বেরিলি শরীফের আল্লামা শাহ আহমদ রেজা খানের পবিত্র হাতে বায়াত হয়ে কঠোর রেয়াজত, এবাদত ও মোরকাবা মোশাহেদায় নিমগ্ন হয়ে নিসবত হাসিল করলে মোর্শেদে কামেল আল্লামা শাহ আহমদ রেখা খান বেরলবীর নিকট থেকে কাদেরিয়া তরিকায় খেলাফত লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। এ-রূপ একজন যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গের হাতে বায়াত হয়ে খেলাফত লাভ সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে ‘ইহা আল্লাহ প্রদত্ত অনুগ্রহ, তিনি যাঁকে চান দান করেন। আল্লাহই মহান অনুগ্রহের মালিক’। সৈয়দ জমির উদ্দিন খেলাফত লাভের পর তাঁর মোর্শেদ কেবলা তাঁকে দ্বীনি মযহাবের প্রচার প্রসার ও সুফিবাদ বিকাশে অবদান রাখার আদেশ দিয়ে নিজ অঞ্চলে ফিরে যেতে বলেন। এখানে প্রনিধানযোগ্য যে, আল্লামা শাহ আহমদ রেযা খান বেরলবী তাঁর বুজুর্গ পিতা মাওলানা শাহ নক্বী আলি খানের সাথে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র একুশ বছর বয়সে হযরত শাহ আল ই-রসুল (ওফাত ১২৯৬ হিজরি)- এর পবিত্র দরবারে গমন করে বায়াত হন এবং কঠোর রেয়াজতের মাধ্যমে তাসাওফ চর্চায় উন্নতির উচ্চশিখরে গমন করে কাদেরিয়া তরিকায় খেলাফত লাভে ধন্য হন। পরবর্তীতে তিনি ভারতের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল, পাকিস্তান ও বার্মার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করার পর স্বীয় পীরের নির্দেশে দ্বীনি মযহাবের প্রচার, প্রসার ও সুফিবাদ বিকাশে অবদান রাখার জন্য নিজ অঞ্চলে ফিরে আসেন। সৈয়দ জমির উদ্দিন আধার মানিক এলাকায় এসে দ্বীন মযহাবের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন এবং পূর্ব গুজরায় মানুষকে আধ্যাতিœকতা শিক্ষা দেয়ার লক্ষে সৈয়দ বাড়ি জামে মসজিদ ও মসজিদ সংলগ্ন খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। সৈয়দ জমির উদ্দিন এমন একজন আধারে মানিক সদৃশ আলোকোজ্জ্বল মহান বুজুর্গ ছিলেন যাঁর হেদায়েত এবং রুহানি ফয়েজ-বরকত দ্বারা ওই অন্ধকারে নিমজ্জিত এলাকার জনগণ ইসলামের আলোয় আলোকিত হন।


এখানে আরো উল্লেখ্য যে, পীরে কামেল হযরত শাহ সুফি মওলানা সৈয়দ জমির উদ্দিন (রহঃ) হলেন উপমহাদেশের কাদেরীয়া তরীকত প্রচারকদের মধ্যে অন্যতম এবং রাসূল পাক (সাঃ) এর ত্রিশতম বংশধর। রাসূল পাক (সাঃ) হতে তার বংশীয় শাজরাহ হলো- (১) হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাহার কন্যা (২) হযরত খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুজ্জাহরা (রাঃ) ও তাহার জামাতা, আমিরুল মোমেনিন হযরত মাওলা আলী শেরে খোদা (রাঃ), তাহার পুত্র (৩) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম আলী মোকাম হাসান (রাঃ), তাহার পুত্র (৪) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম হাসান মুছান্না (রাঃ), তাহার পুত্র (৫) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম আবদুল্লাহ মাহজ (রাঃ), তাহার পুত্র (৬) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম মুসা আল জুন (রাঃ), তাহার পুত্র (৭) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম আবদুল্লাহ সানী (রাঃ), তাহার পুত্র (৮) হযরত সাইয়্যেদ মুসা আল সানী (রাঃ), তাহার পুত্র (৯) হযরত সাইয়্যেদ আবু বকর দাউদ (রাঃ), তাহার পুত্র (১০) হযরত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শামসুদ্দীন জাকারিয়া (রাঃ), তাহার পুত্র (১১) হযরত সাইয়্যেদ ইয়াহিয়া জাহেদ (রাঃ), তাহার পুত্র (১২) হযরত সাইয়্যেদ আবু আব্দুল্লাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (১৩) হযরত সাইয়্যেদ আবু ছালেহ মুসা জঙ্গী (রাঃ), তাহার পুত্র (১৪) ইমামুল আউলিয়া গাউছুল আজম, কুতুবে রব্বানী, মাহবুবে সুবহানী শায়খ সৈয়দ মহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী আল হাসানী ওয়াল হুসাইনী (রাঃ), তাহার পুত্র (১৫) হযরত সৈয়দ আবদুর রাজ্জাক (রাঃ), তাহার পুত্র (১৬) হযরত সৈয়দ আবু ছালেহ নছর (রাঃ), তাহার পুত্র (১৭) হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ জামালুদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (১৮) হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ দাউদ (রাঃ), তাহার পুত্র (১৯) হযরত সৈয়দ জালালুদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (২০) হযরত সৈয়দ বাহাউদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (২১) হযরত সৈয়দ তাজুদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (২২) হযরত সৈয়দ জামাল উদ্দীন সানি গৌড়ী (রাঃ), তাহার পুত্র (২৩) হযরত সৈয়দ শামসুদ্দীন গৌড়ী (রাঃ), তাহার পুত্র (২৪) হযরত সৈয়দ শামসের আলী গৌড়ী (রাঃ), তাহার পুত্র (২৫) হযরত সৈয়দ মারুফ শাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (২৬) হযরত সৈয়দ তৈয়ব শাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (২৭) হযরত সৈয়দ আসদ শাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (২৮) হযরত সৈয়দ আহমদ আলী শাহ ওরফে সৈয়দ আউলিয়া (রাঃ), তাহার পুত্র (২৯) হযরত সৈয়দ আশরাফ শাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (৩০) হযরত সৈয়দ জমির উদ্দিন (রাঃ)।


উল্লেখ্য যে, সৈয়দ বংশের এই মহান বুজুর্গগণ বাগদাদ হতে বিচারক, কাজী, ইমামতি ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে দিল্লির ফতেহপুরে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁরা ইলিয়াছ শাহী বংশের গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এর শাসন আমলে (১৩৮৯-১৪০৯) দিল্লি থেকে গৌড়ে হিজরত করেন। পরবর্তীতে সুলতান আকবরের সাথে গৌড়ের সুলতান পরাজিত হলে এই বংশের একটি দল চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে ইসলাম প্রচারের উদ্যেশ্যে হিজরত করে বসতি স্থাপন করেন। তারা যে স্থানে এসে বসতি স্থাপন করেন ঐ অঞ্চলের নাম সৈয়দপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐ দলের মধ্যে সৈয়দ মারুফ শাহ এবং সৈয়দ কুতুব শাহ ছিলেন যারা সম্পর্কে মামা ও ভাগিনা ছিলেন। হযরত মারুফ শাহ এর প্রপৌত্র সৈয়দ আউলিয়া সপ্তাদশ শতাব্দির প্রথম দিকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বোয়ালখালীর সৈয়দপুর থেকে রাউজান উপজেলার মগ অধ্যুষিত আধার মানিক এলাকায় হিজরত করে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন।
আঁধার মানিক হতে সৈয়দ জমির উদ্দিন পূর্ব গুজরাবাসীর অনুরোধে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পূর্ব গুজরায় বসতি স্থাপন করেন। ওই সময় কোন ছাপাখানা ছিল না। তিনি নিজ হাতে পবিত্র কোরআন শরীফ লিখে এলাকার মানুষের কাছে বিতরণ করে শিক্ষা দিতেন। তার হাতের লেখা একটি কোরআনের কপি এখনও তার প্রপৌত্র সৈয়দ নেছার উদ্দিন ইবনে সৈয়দ নুরুজ্জামান এর নিকট এবং একটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। সৈয়দ জমির উদ্দিন সংসারী ছিলেন। তিনি তিন ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁরা হলেন সৈয়দ কালন, সৈয়দ ফজল, সৈয়দ মালেকুজ্জামান এবং সৈয়দা আলফা বেগম। তিনি প্রায় সময় গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) এর সান্নিধ্যে গমন করে ফয়েজ, বরকত, রহমত লাভে ধন্য হতেন। এই মহান বুজুর্গ পরিপূর্ণভাবে শরিয়তের অনুসারী ছিলেন। তিনি ছিলেন সুকন্ঠের অধিকারী ও মিষ্ঠ ভাষী এবং তার হাতের লেখা ছিল মুক্তার মতন সুন্দর। তিনি আধ্যাত্মিক সাধনায় একজন সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন। তার আধ্যাতিœকতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তার নিকট বিভিন্ন মকসুদ হাসিলের জন্য জনগন আসতে থাকে এবং তাদের মকসুদ পূর্ণ হতে থাকে। এ-কারণে পূর্ব গুজরাবাসি তাঁকে বিশাল সম্পত্তি প্রদান করে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। পূর্ব গুজরায় তার অবস্থানের কারণে তার বাড়িকে সৈয়দ বাড়ি বলা হয়। তিনি ১৭ জানুয়ারী ১৯৩০ সালে ইন্তিকাল করেন।

সূত্র ঃ
(১) ডি.এস.এম এয়াকুব আলী, চট্টগ্রামের বার আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬১.
(২) সৈয়দ ইসমাইল হোসাইন, রাউজানের ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা: ২১৪-২১৫.

লেখক ও গবেষক- mdnazruli55@yahoo.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here