সড়কে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুর মিছিল, পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

415

নুর মোহাম্মদ রানা (লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিষ্ট)♦

 সড়কে অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুর মিছিল, পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি”

জন্মিলে মরিতে হইবে, সত্য প্রবাদ। কিন্তু অনাকাঙ্খিত মৃত্যু কখনো কারো কাম্য নয়। কেননা একটি অনাকাঙ্খিত মৃত্যু একটি পরিবারের জন্য সারাজীবনে কান্নার রোল বয়ে আনে। ইদানিং প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও সড়ক দুর্ঘটনার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে। আর সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এ মিছিল অপ্রতিরোধ্য। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে এবং আহত হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিকভাবেও পঙ্গু করে ফেলে ওই পরিবারকে।

কোন কোন দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি প্রাণ হারান। তখন ওই পরিবারের যে কী অবস্থা হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যারা পঙ্গুত্ববরণ করে তাদের পরিবারের অবস্থা আরও করুণ, আরও শোচনীয়। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে গড়ে বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা দেড় ভাগ নষ্ট হয়, যার পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। সঙ্গতকারণেই এই সমস্যা থেকে মানুষজনকে মুক্ত রাখার সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

বেপরোয়া গাড়ি চালানোই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে চিহ্নিত। আলোচ্য দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও সেটা লক্ষ্য করা গেছে। চালকদের বড় অংশই যে অদক্ষ, অপ্রশিক্ষিত, লাইসেন্সবিহীন, প্রতিযোগিতাপ্রবণ এবং ট্রাফিক আইন বেতোয়াক্কাকারী, সেটা বার বার পর্যবেক্ষণ, সমীক্ষা ও গবেষণায় উঠে এসেছে। এরপরও এদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা ও তাতে হতাহতের ঘটনা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। পুলিশের হিসাবে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ২ থেকে ৩ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে এ সংখ্যা ৬ থেকে ৭ হাজার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের মতে ১২ হাজার থেকে ১৪ হাজার। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দাবি, ২০ হাজারেরও বেশি।

একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা, সাত মাস আগে শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব প্রতিবাদ আন্দোলন, নানা আশ্বাসের ফুলঝুড়ি কিংবা পরামর্শ কোনো কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না সাড়াদেশের সড়কে মৃত্যুর মিছিল। অব্যাহত নৈরাজ্যের কারণে সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। প্রায় প্রতিদিনই নিহতের তালিকায় যুক্ত হচ্ছে একেকটি নাম। সর্বশেষ এ তালিকায় যোগ হলো আরেকটি নাম-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী (২০)।

চলমান ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহের মধ্যেই সড়ক আইন মেনে চলার পরও ঘাতক বাস কেড়ে নিল নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে সক্রিয় এই ছাত্রের প্রাণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেপরোয়া বাসচালক ও তাদের গডফাদারদের কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। পরিস্থিতির উন্নতি করতে যাদের কাজ করার কথা তারা নিষ্ক্রিয় থাকলে সড়কের অরাজকতা থামানো যাবে না। বাস দাঁড়ানোর জায়গা আছে কিন্তু সেখানে দাঁড়ায় না একটি বাসও। যারা এই সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ করেন বা সুষ্ঠু করতে কাজ করেন তারাও এ থেকে লাভের গুড় খেতে ব্যস্ত। তাই সরষের ভূত সরানো না গেলে এই পরিস্থিতির উত্তরণ সম্ভব নয়। সম্প্রতি রাজধানীতে সুপ্রভাত পরিবহনের একটি বাসের চাপায় নিহত হন বিইউপি ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী।

জেব্রা ক্রসিং দিয়ে সড়ক পার হওয়ার সময়ই ঘাতক বাসটি তাকে চাপা দেয় বলে সহপাঠী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। একজন ছাত্রের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সড়কে নেমে আসেন বিইউপি, নর্থ সাউথ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, তিতুমীর কলেজসহ আশপাশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আট দফা দাবিতে বিকেল পর্যন্ত গোটা এলাকার সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন তারা। এভাবে একে একে সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ। এরপর কে? সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আবরার আহমেদ চৌধুরীর সহপাঠীদের প্রশ্ন এটা। আবরারের সহপাঠীরা জানতে চেয়েছেন এটা ‘কয়লার রাস্তা না রক্তের রাস্তা’।

এর আগে ৫ ফেব্র“য়ারি রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে দুই ছেলেমেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন মা-বাবা। মায়ের হাত ধরে ছেলে আর বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছিল মেয়ে ফাইজা তাহমিনা সূচি। এ সময় একা যেতে পারবে জানিয়ে বাবার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয় ১০ বছরের কন্যাশিশুটি। রাস্তাটুকু প্রায় পারই হয়ে গিয়েছিল সে, ঠিক তখনই পেছন থেকে শিশু সূচিকে পিষে ফেলল বেপরোয়া একটি বাস। হতবিহ্বল চোখে নির্মমতম দৃশ্য দেখেন বাবা-মা। এভাবে দেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রতিদিনই কারো না কারো জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে ‘দুর্ঘটনা’ নামক দানবের হাতে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার বেশ কয়েকটি কারণ খতিয়ে দেখা হয়েছে। তার মধ্যে গাড়ি চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোকেই প্রধান হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেখা যায় অধিকাংশ গাড়ি চালকের লাইসেন্স কিংবা অভিজ্ঞতা এবং ড্রাইভিংয়ের যথেষ্ট জ্ঞান নেই! অধিকাংশ গাড়িচালক নেশাগ্রস্ত! অনেক সময় হেলপারকেও চালকের আসনে বসিয়ে দেয়া হয়। আর সড়কে কে কাকে ওভারটেক করে আগে এগিয়ে যাবে গাড়ি চালকদের মধ্যে এই প্রতিযোগিতা তো আছেই। ওভারটেক করা নিষেধ করা সত্ত্বেও মানতে নারাজ বেপরোয়া গাড়িচালকরা। বরং গতি বাড়িয়ে অশুভ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে গাড়িচালকরা।

বিগত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা এখন অন্যতম জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সঙ্গতকারণেই এই সমস্যা থেকে মানুষজনকে মুক্ত রাখার সার্বিক পদক্ষেপ গ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।’

উল্লেখ্য, সড়কদুর্ঘটনা ও হতাহতের এই পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তব চিত্র আরো ভয়াবহ। কারণ এসব তথ্য-পরিসংখ্যান হচ্ছে পত্রিকা নির্ভর। সড়কদুর্ঘটনা নিয়ে যারা কাজ করেন তারা বলছেন, সংবাদসম্মেলনে উপস্থাপিত সংখ্যার চাইতেও অনেক বেশি দুর্ঘটনা এবং অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ছোট-বড় অনেক দুর্ঘটনার এবং হতাহতদের খবরই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। সব বিবেচনায় নিলে স্বীকার না করে উপায় নেই যে, দেশে সড়কদুর্ঘটনার পাশাপাশি নিহত এবং আহতদের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে চলেছে। এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। মনে রাখা দরকার প্রতিটি প্রাণই অমূল্য। আর যারা আহত হয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারায়, কর্মক্ষমতা হারিয়ে পরিবারের বোঝায় পরিণত হয়, তাদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে।

বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্ট বলছে, বিশ্বে সড়কদুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। বাংলাদেশে সড়কদুর্ঘটনায় এক দশকে যত মানুষ মারা যায়, বড় বড় যুদ্ধেও এত মানুষ মারা যায়নি। ড্রাইভারদের গাফিলতির কারণে ও অদক্ষতায় সংঘটিত দুর্ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে পথে বসে অনেক পরিবার। স্বেচ্ছাচারিতা ও বেপরোয়া গতিই যে সড়কদুর্ঘটনার প্রধান কারণ তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

নিরাপদ সড়ক চাই-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ঘুষবাণিজ্যসহ পুলিশের বিভিন্ন অপরাধও দুর্ঘটনা ও মৃত্যুসহ ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী। বিভিন্ন অনুসন্ধানী রিপোর্টও তাই বলছে। কিন্তু কেনো বেপরোয়া চালকদের রাশ টানা যাচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। হতাহতের এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পরিবার যেমন চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তেমনি ক্ষতির শিকার হচ্ছে রাষ্ট্র। প্রসঙ্গত, গত কয়েক দশকে সড়কনেটওয়ার্ক দেশের মহানগরী থেকে আনাচে-কানাচে বিস্তৃৃত হয়েছে। বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা এবং নাগরিক চলাচল। কিন্তু সেই অনুপাতে মনোযোগ দেয়া হয়নি সড়কপথের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতি।

সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সরকার ও নাগরিকসমাজ মনোযোগ দিলেও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাবে জনকাঙ্খিত ফল আসছে না। সরকারের উচিত হবে এ বিষয়ে আরো আন্তরিক পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া। দুর্ঘটনা ও মৃত্যু কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে যাত্রীকল্যাণ সমিতি কয়েকটি সুপারিশ পেশ করেছে। সুপারিশের আকারে উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়কে ট্রাফিকের নিদেশনা মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা, যেখানে-সেখানে গাড়ি রাখা নিষিদ্ধ করা, নির্দিষ্ট স্থান বা স্টপেজ ছাড়া যাত্রীদের ওঠানো-নামানো নিষিদ্ধ করা, ওভারটেকিং এবং বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এসবের বাইরে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস দিয়ে যাতায়াত করার ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কথাও রয়েছে সুপারিশমালায়। সরকারের উচিত হবে সেসব সুপারিশ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া। আমরা মনে করি, সব মিলিয়ে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হলে সড়ক-মহাসড়কেই শুধু নয়, রেল ও জলপথেও দুর্ঘটনা কমে আসবে। আর এই ব্যবস্থা নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদী সামগ্রিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে- যার মধ্যে বাস-ট্রাক ও ট্রেন তো বটেই, লঞ্চ ও স্টিমারসহ সব ধরনের নৌযানকেও অন্তর্ভুক্ত রাখতে হবে। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে সড়কদুর্ঘটনা রোধে জোরালো প্রতিশ্র“তি দিয়েছে। তা আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দুর্ঘটনা অন্তত ৫০ ভাগে নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা আশা করতে চাই, সরকার সড়কদুর্ঘটনা রোধে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই গ্রহণ করবে।

রাউজান নিউজ/অামির হামজা, বার্তা বিভাগ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here