ত্রাণ চোর : করোনাকালে আরো বেশি সক্রিয়

74

ত্রাণ চোর : করোনাকালে আরো বেশি সক্রিয়

মোরশেদ তালুকদার, সংবাদকর্মী :

“প্রায় অর্ধেক লোককে সাহায্য দেওয়া হইয়াছে, এমন সময় তাম্বুর সামনে একখানা নৌকা ভিড়িল ।
দুইজন ভদ্রলোক নৌকা হইতে নামিলেন। কেন্দ্রকর্তা ‘আসুন চক্রবর্তী’ মশাই, আসুন চৌধুরী সাহেব” বলিয়া তাঁহাদিগকে অভ্যর্থনা করিয়া হামিদের নিকট আনিলেন এবং লোহার চেয়ারি বসিতে বলিলেন।
তারপর তিনি হামিদের দিকে চাহিয়া বলিলেন : ইনস্পেক্টর সাব, এরা দুইজন রঘুনাথপুরের শ্রীযুক্ত যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও শমশের আলী চৌধুরী। আহা! বন্যায় ভদ্রলোকদের যা অবস্থা হইয়াছে, তা আর বলিবার নয়। গোলার ধান চাল সব বন্যায় ভাসাইয়া নিয়াছে। কই হে শরৎ, বাবুদের চাল-ডালটা নৌকায় পৌছাইয়া দাও ত ।
যতীন বাবু ও চৌধুরী সাহেব ব্যস্ত হইয়া বলিলেন : না, না, এরা দিয়া আসিবে কেন, আমাদের সঙ্গেই লোক আছে। কইরে রামটহল, ইনাতুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আয় ত। চৌকিদারী ইউনিফর্ম পরা লোক নৌকা হইতে ছালা ও ডালি লইয়া নামিয়া আসিল । এতক্ষণ সমবেত কৃষকগণের মধ্যে যাহারা চাউল বিতরণ করিতেছিল, তাহারা সকলেই বিতরণ-কার্য অর্ধ সমাপ্ত রাখিয়া ত্রস্তব্যস্ত চাউল-ডাউল মাপিয়া দুই বস্তা চাউল, এক ডালি ডাউল, এক ডালি লবণ মরিচাদি দিয়া দুইজনকে বিদায় করিল।
ভদ্ৰলোকদ্বয় উঠিয়া সকলকে ধন্যবাদ দিয়া হামিদকে নমস্কার ও আদাব দিয়া নৌকায় উঠিলেন।
কেন্দ্রকর্তা বন্যায় উহাদের ক্ষতির পরিমাণ সবিস্তার হামিদের নিকট বর্ণনা করিতেছিলেন ।
সেদিকে হামিদের কান ছিল না। সে স্তম্ভিতের মতো বসিয়া সম্মুখস্থ অর্ধনগ্ন নরকঙ্কালগুলির দিকে চাহিয়াছিল। তার অজ্ঞাতেই বোধ হয় তার চক্ষে অশ্রু ঠেলিয়া উঠিতেছিল।
অতিকষ্টে প্রকৃতিস্থ হইয়া হামিদ কঠোর ভাষায় কেন্দ্রকর্তাকে জিজ্ঞাসা করিল : এঁদের দুইজনকে কতজনের খোরাক দিলেন?
কেন্দ্রকর্তা উৎসাহভরে বলিলেন : এঁদের বিরাট ফ্যামিলি। এতক্ষণ তবে আর বলিলাম কি আপনার কাছে? জোত-জমি বাড়িতে দালান-কোঠা………
বাধা দিয়া হামিদ বলিল : কই ইঁহাদের ত টিকিট চেক করিলেন না?
কেন্দ্রকর্তা বিস্মিত হইয়া বলিলেন : বলেন কি? ইঁহাদের মতো লোক কি আর ফাঁকি দিয়া অতিরিক্ত চাউল লইতে পারে?
হামিদ রাগ সামলাইতে পারিল না। ঈষৎ ব্যঙ্গস্বরে বলিল : এই সমস্ত অভুক্ত কৃষক কি তবে ফাঁকি দিয়া অতিরিক্ত চাউল নেয়?
কেন্দ্রকর্তা অভিক্ষের মাতব্বরির স্বরে হাসিয়া বলিলেন : “আপনি রাখেন না এদের বদমায়েশির খবর। ইহারা-”
হঠাৎ গোলমালে তাহদের কথোপকথনে বাধা পড়িল ।”

ক’দিন ধরে মানুষের মুখে মুখে কেবল ‘ত্রাণচোর’র নানা কাহিনি শুনছি। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় মানুষের জন্য সরকারি বরাদ্দ আত্নসাৎ করছেন বলেই এসব ‘ত্রাণচোর’ সম্পর্কে বলা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকায়ও আসছে ত্রাণচোরদের খবর। এসব চোরের খবর পড়তে গিয়ে মনে পড়ল সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ ( ১৮৯৮-১৯৭৯) এর কথা। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ব্যঙ্গরচনার সংকলন ‘ফুড কনফারেন্স’।

উপরের অংশটি (“প্রায় অর্ধেক লোককে….. বাধা পড়িল”) “ফুড কনফারেন্স” গ্রন্থভুক্ত “রিলিফ ওয়ার্ক” এর অংশবিশেষ মাত্র। এ রচনা পাঠ করলে ত্রাণ বিতরণে যে ‘নয়ছয়’ হয় তার একটা চিত্র পাওয়া যায়। বিশেষ এ রচনার একটি পর্যায়ে যখন আবুল মনসুর আহমদ লিখেন, “মোটরলঞ্চে করিয়া জলে ভাসমান ভেলায় বাস-করা অভুক্ত কঙ্কালসার কৃষকগণকে দু-চার সের চাউল দিয়া আসিয়া রাত্রিবেলা তাম্বুর মধ্যে রাশি রাশি কম্বল-বিছানা খাটিয়ার উপর শয়ন করিয়া অঘোরে নিদ্রা যাইতে অথবা চা-সিগারেটসহ রাত্রি জাগিয়া তাস পিটিতে হামিদের প্রথম-প্রথম ভাল লাগিল না”, তখন ত্রাণ বিতরণের নামে কি হয় তার একটা ধারণা পাওয়া যায়।

অথবা ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমের কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শনের দায়িত্ব পাওয়া হামিদ যখন দেখে, ” রিলিফ ফান্ডের টাকায় চৌদ্দআনা কর্মীদের ভরণ-পোষণে ব্যয় হইতেছে। বাকী দুই আনায় মাত্র সেবাকার্য চলিতেছে” তখন পাঠকের সামনে সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠে।

কিছুদিন আগে আবুল মনসুর আহমদ নিয়ে দীর্ঘ রচনা পড়ার সুযোগ হয়েছিল। সম্ভবত প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছিল সেটি। সেখান ‘ফুড কনফারেন্স’ এর মূল্যায়ন করতে গিয়ে লেখক বলেছিলেন, “ব্যাঙ্গরচনার সংকলন ফুড কনফারেন্সে আবুল মনসুর আহমদ মানুষের অসহায়তা নিয়ে খেলা করা রাজনৈতিক নেতা, নীতিহীন ব্যবসায়ী এবং তথাকথিত সমাজসেবকদের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। বাংলা ১৩৫০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় সেই সময়ের নেতারা যে ব্যর্থ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং দুর্ভিক্ষ দূরীকরণে তাদের সকল কর্মকাণ্ড যে মিটিং- কনফারেন্সেই সীমাবদ্ধ ছিল, তা এ গ্রন্থের নামগল্প ‘ফুড কনফারেন্সে’ লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন।”

‘ফুড কনফারেন্স’ নিয়ে আরেকজন লিখেছিলেন, “অনেক আগের কাহিনী ও চিত্র। ইতিমধ্যে আমরা স্বাধীনতা লাভ করিয়াছি কিন্তু সে চিত্র আজও তেমনি জীবন্ত ও বাস্তব। শস্যভান্ডারে আজও তেমনি আকাল চলিতেছে।”

পুনশ্চ – করোনার দিনে যারা এখন বাসাবন্দী তারা অলস সময় পার করতে মগ্ন হতে পারেন ‘ফুড কনফারেন্স’ নিয়ে। এতে অন্তত এটা ধারণা পাবেন, এখন যারা ত্রাণচোর হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছেন তাদের পূর্বপুরুষরাও এ কাজে কম সিদ্ধহস্ত ছিলেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here