আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি আল্লামা সৈয়দ আবদুল জলিল (রহ:) জীবনী

334

মোঃ নজরুল ইসলাম. লেখক ও গবেষকঃ

“আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি আল্লামা সৈয়দ আবদুল জলিল (রহ:) জীবনী”

হযরত শাহ সুফি আল্লামা সৈয়দ আবদুল জলিল তাসাওফ চর্চার ক্ষেত্রে কঠোর সাধনা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মারেফতের সর্বোচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। রাউজান উপজেলা আধার মানিক গ্রামের সৈয়দ আউলিয়ার বাড়িতে ১৮৮৫ সালে এই বুজুর্গ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সৈয়দ সমি উদ্দিন। সৈয়দ মারুফ শাহ (রহ:) এবং সৈয়দ বখতিয়ার মাহি সাওয়ার এর বংশধর তিনি। এ-পবিত্র বংশে অনেক পীর মাশায়েখের জন্ম হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শাহ সুফি মাওলানা সৈয়দ আবদুল জলিল। তিনি একজন আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও কারামত সম্পন্ন অলি আল্লাহ ছিলেন বলে আল্লামা আজিজুল হক শেরে বাংলা তার ‘‘দেওয়ানে আজীজ’’ ফারসী কসিদা গ্রন্থে তার প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভারতে গমন পূর্বক কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করেন। পরে তিনি বিভিন্ন পীর মাশায়েকের দরবারে গমন পূর্বক তাদের থেকে ফয়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হন। এরপরে তিনি ভারতবর্ষের প্রখ্যাত হাদিস শাস্ত্রবিদ ও ভারতবর্ষের পীর আল্লামা শাহ সৈয়দ নঈমুদ্দীন মুরদাবাদীর নিকট হাদীস শাস্ত্র অধ্যায়ন শেষে সনদ লাভে ধন্য হন। তিনি হাদীস শাস্ত্র অধ্যায়নের সময় আল্লামা শাহ সৈয়দ নঈমুদ্দীন মুরদাবাদীর পবিত্র হাতে বায়াত হন এবং কঠোর ইবাদত ও রিয়াজতের মাধ্যমে স্বীয় পীর হতে খেলাফত লাভে ধন্য হন। এখানে উল্লেখ্য যে, তাকে স্বীয় পীর ছাড়াও তৎকালীন চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের খতিব বাগদাদ শরীফ থেকে আগত আওলাদে রাসূল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আবদুল হামিদ বোগদাদীসহ অসংখ্য পীর মাশায়েকগন কাদেরীয়া, চিশতীয়া, নক্সবন্দীয়া, মোজাদ্দেদীয়াসহ বিভিন্ন তরিকতের খেলাফত প্রদান করেন। 

এখানে উল্লেখ্য যে, তার পূর্ব পুরুষগণ বিচারক, কাজী, ইমামতি ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে দিল্লির ফতেহপুরে বসতি স্থাপন করেন। পরবতীতে তাঁরা ইলিয়াছ শাহী বংশের গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এর শাসন আমলে (১৩৮৯-১৪০৯) দিল্লি থেকে গৌড়ে হিজরত করেন। পরবর্তীতে সুলতান আকবরের সাথে গৌড়ের সুলতান পরাজিত হলে এই বংশের একটি দল চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে ইসলাম প্রচারের উদ্যেশ্যে হিজরত করে বসতি স্থাপন করেন। তারা যে স্থানে এসে বসতি স্থাপন করেন ঐ অঞ্চলের নাম সৈয়দপুর নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐ দলের মধ্যে সৈয়দ মারুফ শাহ এবং সৈয়দ কুতুব শাহ ছিলেন যারা সম্পর্কে মামা ও ভাগিনা ছিলেন। হযরত মারুফ শাহ এর প্রপৌত্র সৈয়দ আউলিয়া সপ্তাদশ শতাব্দির প্রথম দিকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বোয়ালখালীর সৈয়দপুর থেকে রাউজান উপজেলার মগ অধ্যুষিত গুজরা নামক এলাকায় হিজরত করে বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। তাঁর আগমনের পূর্বে এই এলাকাটি ছিল মগ অধ্যুষিত, শিক্ষায়-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত ও অনুন্নত অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি এলাকা। অন্ধকারে মানিক যেমন আলো ছড়ায় ঠিক তেমনি সৈয়দ আউলিয়া (রহ.) এই এলাকার মানুষের মাঝে ইসলামের আলো ছড়িয়ে এই এলাকার মানুষকে এবং এলাকাটিকে আলোকিত করেছেন বলে এই এলাকার নাম ‘‘আন্ধার মানিক’’ নামে পরিচিতি লাভ করে। আবার অন্য একটি সূত্র মতে, সৈয়দ আউলিয়া ও তার উপযুক্ত বুজুর্গ আওলাদ সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন, সৈয়দ আবদুল জলিল ও সৈয়দ জমির উদ্দিন এই অঞ্চলে অবস্থান করে এলাকার অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষের মাঝে ইসলামের আলো ছড়িয়ে এই এলাকার মানুষকে ও এলাকাটি আলোকিত করেছেন বলে এই এলাকাটি ‘‘আধার মানিক’’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তিনি প্রতি বছর নির্দিষ্ট তারিখে রহমতুল্লিল আলামিন হযরত মুহম্মদ মুস্তাফা (দ.)-এর শানে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) মাহফিলের আয়োজন করতেন এবং ওই মাহফিলে প্রতি বছর ইমামে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত আল্লামা কাযী নুরুল ইসলাম হাশেমী (মঃ) তশরিফ নিতেন। এখানে প্রনিধানযোগ্য যে, আল্লামা সৈয়দ আবদুল জলিল হাশেমী সাহেবকে পুত্র হিসেবে জানতেন এবং হাশেমী সাহেবও আপন পিতার ন্যায় মান্য করতেন। এ-ছাড়া নুরুল ইসলাম হাশেমী হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আবদুল জলিলের পবিত্র দরবারে গিয়ে ওই মহান শায়খের হাতে বায়াত হয়ে কঠোর রেয়াজতে নিমগ্ন হতেন এবং তাসাওফ চর্চায় প্রভূত উন্নতি দেখে সৈয়দ আবদুল জলিল আল্লামা হাশেমী সাহেবকে কাদেরিয়া তরিকায় খেলাফত দিয়ে তরিকতের প্রতিনীধিত্ব এনায়েত করেন। এছাড়াও তিনি পূর্ব গুজরা সৈয়দ বাড়ীর হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মালেকুজ্জামানকে খেলাফত প্রদান করে ধন্য করেন। তাছাড়া চান্দগাও থানাধীন বাহির সিগন্যানের আল- আমিন বারীয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও আল আমিন বারীয়া দরবার শরীফের প্রাণ পুরুষ পীরে তরিক্বত হযরত শাহ সুফি হাফেজ ক্বারী আবদুল কারেক শাহ ও গশ্চি খোয়েখালীর হযরত শাহ বজল আহমদ ফকিরসহ অনেক পীর বুজুর্গগণ দীর্ঘদিন তার খেদমত করে তার নিকট হতে শরীয়ত ও তরীকতের জ্ঞানার্জন করেন এবং তার নিকট হতে ফয়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হন। শাহ আবদুল জলিল আজীবন দ্বীন মযহাবের খেদমতে নিজেকে উৎসর্গ করে আল্লাহর মাহবুব বান্দায় পরিণত হয়েছেন। তিনি এমন এক ব্যতিক্রমধর্মী সাধক পুরুষ ছিলেন যে, জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাগবে ও ইসলামের খেদমতে বিশেষ ভুমিকা রাখতেন। জনসাধারণের চলাচলের জন্য মগদাই খালের উপর সেতু নির্মান করে দেন। এ-ছাড়া সৈয়দ আউলিয়া জামে মসজিদের খরচ নির্বাহের জন্য পাঁচকানি এবং কাগতিয়া আলীয়া মাদরাসার জন্য এককানি জমি প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি কদলপুর হামিদিয়া ফাযিল মাদরাসাসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। কোন মানুষ তার নিকট সাহায্যের জন্য আসলে তিনি কখনো কাউকে ফিরিয়ে দেননি। তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি মানুষের উন্নয়নের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। সৈয়দ আবদুল জলিল (রহঃ) এর অজস্র কারামত হতে কয়েকটি কারামত উপস্থাপন করা হলো ঃ –

চট্টগ্রাম শহরের বাকলিয়া এলাকায় কলেরা রোগ মহামারি আকার ধারণ করে এবং অসংখ্য মানুষের জীবনহানি ঘটে। তখন এলাকাবাসী আল্লামা সৈয়দ আবদুল জলিলের দোয়া প্রার্থনা করেন। তিনি আর পাপ কাজে লিপ্ত না হওয়ার ওয়াদা নিয়ে কয়েকজন মুমিন লোক সাথে নিয়ে পুরো এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। এরপর আর কখনো ঐ এলাকায় কলেরা মহামারি হয় নি। হাট হাজারী মেখল নিবাসী মোঃ আবদুল গনি দীর্ঘদিন যাবৎ অপুত্রক ছিলেন। একদা তিনি হুজুর সৈয়দ আবদুল জলিল এর কথা লোক মুখে শুনে তার নিকট দোয়া প্রার্থী হলেন। হুজুরকে তার সমস্যার কথা জানালে হুজুর তার জন্য দোয়া করেন এবং তার নাম মোহাম্মদ আবদুল করিম রাখার জন্য বলেন। পরবর্তী বছর তার একটি পুত্র সন্তান হলে তার নাম রাখেন মোহাম্মদ আবদুল করিম।

সৈয়দ আবদুল জলিল প্রতি বছরের ন্যায় ঈদে মিলাদুন্নবী মাহফিলের আয়োজন করলে মাহফিলের মধ্যে প্রচন্ড ঝড়ের আভাস দেখা দিলে তিনি তার হাতের লাঠি দিয়ে মাহফিলের চারদিকে দাগ টেনে দেন। পরে দেখা গেল মাহফিলের চারদিকে ঝড় হলেও মাহফিলে কোন ঝড় হয়নি।

হযরত সৈয়দ আবদুল জলিল (রহ.) বার্মায় অবস্থানকালে তার কামালিয়তের মাধ্যমে জানতে পারলেন যে, তার এলাকায় এক প্রকার কাক অবস্থান করার কারণে কলেরা মহামারী আকার ধারণ করে এবং সকলে তার উপস্থিতি কামনা করেন। তিনি মুহুর্তের মধ্যে বার্মা হতে এলাকায় এসে কাকদেরকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বললে তখন কাকেরা কান্না করতে করতে এলাকা ছেড়ে চলে যায় এবং এরপর ঐ এলাকায় আর কখনো কলেরা হয়নি।

উরকিরচর ইউনিয়নের খলিফাঘোনা এলাকায় হালদা নদীতে বেশ কয়েক বছর মাছের ডিম ছাড়া বন্ধ ছিল। তখন এলাকাবাসী শাহসুফি সৈয়দ আবদুল জলিলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন, যাতে প্রতি বছর মাছে ডিম ছাড়ে। একদিন ভোরে সৈয়দ আবদুল জলিল একটি কাগজে পত্রের ন্যায় কিছু লিখে হালদা নদীর নাপিতের ঘাট এলাকায় নিক্ষেপ করেন। এরপর হতে প্রতি বছর হালদা নদীতে মাছে ডিম ছাড়া আরম্ভ করে এবং তা এখনো চালু আছে।

রাউজান উপজেলার খলিফাঘোনার চরাঞ্চলে ধান ও শষ্য ক্ষেতে পোকার আক্রমনে ফসলের মাঠ উজার হয়ে যায়। তখন সৈয়দ আবদুল জলিল এলাকাবাসির অনুরোধে ক্ষেতটি প্রদক্ষিণ করার পর ওই মাঠে পোকার আক্রমন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পীকার ও বিশিষ্ট নেতা এ,কে,এম ফজলুল কাদের চৌধুরী সৈয়দ আবদুল জলিল (রঃ) এর কাশফ ও কারামতের কথা লোক মুখে শুনে একদিন সৈয়দ আবদুল জলিল (রঃ) এর সাথে সাক্ষাত করার জন্য অহংকার সহকারে ঘোড়া হাকিয়ে তার হুজরার দিকে ছুটে গেলেন। কিন্তুু তিনি যখন পশ্চিম আধার মানিক নুকুল মহালদার বাড়ী বড়–য়া পাড়ার কাছাকাছি গেলেন তখন তার ঘোড়াটি মাটিতে বসে পরে। তিনি শত চেষ্টা করেও যখন ঘোড়াটি মাটি থেকে উঠাতে পারলেন না তখন বুঝতে পারলেন যে, তিনি গর্ব সহকারে তার সাথে সাক্ষাত করতে চেয়েছেন বলেই তার ঘোড়ার এই অবস্থা। পরে তিনি হুজুরের কাশফ ও কারামতের কথা বুঝতে পেরে আদব সহকারে পায়ে হেটে সৈয়দ আবদুল জলিল (রঃ) এর হুজরায় গিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপ আলোচনার পর হুজুরের নিকট থেকে দোয়া নিয়ে চলে আসেন। এরপর থেকে তিনি হুজুরকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও ভক্তি করতেন এবং প্রায় সময় পায়ে হেটে হুজুরের নিকট দোয়ার জন্য গমন করতেন।

তিনি ২২ মাঘ ১৯৬৫ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজার শরীফ সৈয়দ আউলিয়ার বাড়িতে বিদ্যমান। প্রতি বছর আধার মানিক শাহী দরবার শরীফে তাঁর ওফাত দিবসে (২২ মাঘ) ওরশ শরীফ মহামহারোহে অনুষ্ঠিত হয়। ওই ওরশ শরীফে তাঁর মুরিদ, ভক্তবৃন্দ ও এলাকাবাসী রুহানী ফয়েজ-বরকত লাভের জন্য দলে দলে উপস্থিত হন।
সূত্র ঃ
(১) আল্লামা সৈয়দ আজিজুল হক শেরে বাংলা আল-কাদেরী, দিওয়ান-ই- আজিজ (বাংলা সংস্করণ), চট্টগ্রাম, ১৯৬১, পৃ. ৩২৭-৩২৯.
(২) ডি.এস.এম এয়াকুব আলী, চট্টগ্রামের বার আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬১.
(৩) সৈয়দ ইসমাইল হোসাইন, রাউজানের ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা: ২১৬-২১৮.
(৪) গৌরব (গুণীজন সংবর্ধনা), পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত (পৃষ্ঠা- ১), প্রকাশকাল- ২৫ এপ্রিল

রাউজান নিউজ.আমির হামজা.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here