আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মালেকুজ্জামান (রহ:) জীবনী

51

মোঃ নজরুল ইসলাম. লেখক ও গবেষক🔴

“আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মালেকুজ্জামান (রহ:)”

প্রখ্যাত সুফি-সাধক ও আওলাদে রাসূল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ মালেকুজ্জামান সব সময়
আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি দুনিয়ার আয়েশী জীবন যাপন হতে দূরে থেকে সব
সময় আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকতে পছন্দ করতেন।

তিনি রাউজান উপজেলার পূর্ব গুজরা
গ্রামে ১৮৯৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ জমির উদ্দিন যিনি এজজন
প্রসিদ্ধ কাদেরীয়া তরিকত প্রচারক এবং প্রখ্যাত সুফি সাধক ছিলেন। সৈয়দ মালেকুজ্জামান
তাঁর বুজুর্গ পিতার নিকট প্রাথমিক শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ভারতে গমন করেন।

সেখানে কোরআন, হাদিস, ফিকাহ ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ জ্ঞানার্জনের পর দেশে ফিরে এসে
বুজুর্গ পিতার খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি পিতার নিকট আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জনের
নিমিত্তে তরিকতের বয়াত হন এবং কঠোর সাধনার পর তাঁকে তাঁর বুজুর্গ পিতা খেলাফত ও
তরিকতের প্রতিনীধিত্ব এনায়েত করে ধন্য করেন।

এছাড়া একটি ঘটনা সৈয়দ মালেকুজ্জামের
জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে, আর তা হলো, তাঁর যখন বারো বছর বয়স একদিন তাঁর পিতা
নামাজের সময় হলে মসজিদে আযান দিয়ে নামাজ আদায় করতে নির্দেশ দেন।

কিন্তু অল্পবয়সের কিশোর সৈয়দ মালেকুজ্জামান মসজিদে নামাজ আদায়ের পরিবর্তে তাঁদের বাংলোঘরে চুপচাপ বসে থাকেন। তখন দেখা যায় যে, চোঁখের নিমিষে একটি গোখরো সাপ তাঁর দিকে আচমকা ফনা তুলে ছোবল মারতে উদ্ধত হয়। তখন তিনি প্রাণ বাঁচিয়ে পিতার কাছে দৌড়ে
এসে কিছু বলার আগেই, তাঁর পিতা জীবনে নামাজ কাজা না করতে উপদেশ দেন।

এতে তাঁর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, নামাজের গড়হাজির থাকায় তাঁর এমনটি হয়েছে। তিনি তাঁর
পিতার এ-কারামতের কথা বুঝতে পেরে সাথে সাথে পিতার নিকট তওবা করে জীবনে নামাজ
কাজা না করার শপথ নেন।

এরপর আর কোনদিন নামাজ কাজা করেন নি তিনি। তিনি ছিলেন রাসূল পাক (সাঃ) এর একত্রিশতম বংশধর ছিলেন। রাসূল পাক (সাঃ) হতে তার বংশীয় শাজরাহ হলো- (১) হযরত আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাহার কন্যা (২)
হযরত খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুজ্জাহরা (রাঃ) ও তাহার জামাতা, আমিরুল মোমেনিন হযরত
মাওলা আলী শেরে খোদা (রাঃ), তাহার পুত্র (৩) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম আলী মোকাম হাসান (রাঃ),
তাহার পুত্র (৪) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম হাসান মুছান্না (রাঃ), তাহার পুত্র (৫) হযরত
সাইয়্যেদেনা ইমাম আবদুল্লাহ মাহজ (রাঃ), তাহার পুত্র (৬) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম মুসা আল
জুন (রাঃ), তাহার পুত্র (৭) হযরত সাইয়্যেদেনা ইমাম আবদুল্লাহ সানী (রাঃ), তাহার পুত্র (৮) হযরত
সাইয়্যেদ মুসা আল সানী (রাঃ), তাহার পুত্র (৯) হযরত সাইয়্যেদ আবু বকর দাউদ (রাঃ), তাহার পুত্র
(১০) হযরত সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শামসুদ্দীন জাকারিয়া (রাঃ), তাহার পুত্র (১১) হযরত সাইয়্যেদ
ইয়াহিয়া জাহেদ (রাঃ), তাহার পুত্র (১২) হযরত সাইয়্যেদ আবু আব্দুল্লাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (১৩)
হযরত সাইয়্যেদ আবু ছালেহ মুসা জঙ্গী (রাঃ), তাহার পুত্র (১৪) ইমামুল আউলিয়া গাউছুল
আজম, কুতুবে রব্বানী, মাহবুবে সুবহানী শায়খ সৈয়দ মহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী আল
হাসানী ওয়াল হুসাইনী (রাঃ), তাহার পুত্র (১৫) হযরত সৈয়দ আবদুর রাজ্জাক (রাঃ), তাহার পুত্র (১৬) হযরত সৈয়দ আবু ছালেহ নছর (রাঃ), তাহার পুত্র (১৭) হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ জামালুদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র
(১৮) হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ দাউদ (রাঃ), তাহার পুত্র (১৯) হযরত সৈয়দ জালালুদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (২০)
হযরত সৈয়দ বাহাউদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (২১) হযরত সৈয়দ তাজুদ্দীন (রাঃ), তাহার পুত্র (২২) হযরত সৈয়দ
জামাল উদ্দীন সানি গৌড়ী (রাঃ), তাহার পুত্র (২৩) হযরত সৈয়দ শামসুদ্দীন গৌড়ী (রাঃ), তাহার পুত্র
(২৪) হযরত সৈয়দ শামসের আলী গৌড়ী (রাঃ), তাহার পুত্র (২৫) হযরত সৈয়দ মারুফ শাহ (রাঃ), তাহার
পুত্র (২৬) হযরত সৈয়দ তৈয়ব শাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (২৭) হযরত সৈয়দ আসদ শাহ (রাঃ), তাহার পুত্র (২৮)
হযরত সৈয়দ আহমদ আলী শাহ ওরফে সৈয়দ আউলিয়া (রাঃ), তাহার পুত্র (২৯) হযরত সৈয়দ আশরাফ শাহ
(রাঃ), তাহার পুত্র (৩০) হযরত সৈয়দ জমির উদ্দিন (রাঃ), তাহার পুত্র (৩১) হযরত সৈয়দ মালেকুজ্জামান
(রাঃ)।

সৈয়দ মালেকুজ্জামান একজন পরিপূর্ন সুন্নতে রাসূলের অনুসারী ছিলেন। তিনি সব সময়
নিজেকে গোপন রাখতেন, কখনো নিজেকে প্রকাশ করতেন না। তিনি প্রায় সময় রোজা
রাখতেন এবং সারারাত নফল ইবাদত করে রাত কাটাতেন।

তিনি সকল শ্রেণির মানুষের সাথে
সহজে মিশতে পারতেন এবং তার বিন¤্র ব্যবহারে মানুষ মুগ্ধ ও বিমোহিত হয়ে যেতেন। তিনি
অছি-এ গাউছুল আজম সৈয়দ দেলোয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারীর প্রতি সমসময় শ্রদ্ধা
নিবেদন করতেন এবং তার নিকট থেকে ফয়েজ, বরকত ও রমহমত লাভের জন্য সদা প্রচেষ্টা চালাতেন।

তিনি দীর্ঘকাল বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনের ‘বগলি জামে মসজিদে’ হযরত শাহ সুফি সৈয়দ
আবদুল জলিল সহ ইমামতি করেন। এখানে আরো উল্লেখ্য যে, তাকে স্বীয় পীর ছাড়াও আধার
মানিকের প্রখ্যাত পীর সৈয়দ আবদুল জলিলও খেলাফত প্রদান করেন। তিনি বার্মা থেকে ফিরে
আসার পর ১৯৭৪ সালে ৪ মার্চ তারিখে তাঁর স্ত্রীকে সদ্য ধোয়া চাদরটি বিছানায় বিছিয়ে
দিতে বলেন।

এতে স্ত্রী সদ্য ধোয়া চাদর শুকায়নি বলে জানালে তিনি বলেন যে, সাথে সাথে শুকিয়ে গেছে। এতে তাঁর স্ত্রী চাদর আনতে গিয়ে চাদরটি শুকনো অবস্থায় পান এবং দরবেশের নির্দেশ মতে বিছানায় বিছিয়ে দেন। চাদর বিছালে সৈয়দ মালেকুজ্জামান বিছানায় শুয়ে পড়েন এবং নিকট আত্মীয়দের ডেকে এনে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে কলেমা পড়তে পড়তে এ-জগত সংসারের মায়া ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান।

তিনি চার ছেলে ও চার মেয়ের জনক
ছিলেন। ছেলেরা হলেন সৈয়দ মনিরুজ্জামান, সৈয়দ খায়েরুজ্জামান, সৈয়দ আশফারুজ্জামান ও
সৈয়দ নুরুজ্জামান। আর মেয়েদের মধ্যে সৈয়দা মেহের খাতুন, সৈয়দা রোকেয়া বেগম,
সৈয়দা রওশন আরা বেগম এবং সৈয়দা দিলওয়ারা বেগম।
সূত্র ঃ
(১) ডি.এস.এম এয়াকুব আলী, চট্টগ্রামের বার আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬১.
(২) সৈয়দ ইসমাইল হোসাইন, রাউজানের ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা: ২১৫-২১৬.
(৩) ডি.এইচ.এম এয়াকুব আলী, চট্টগ্রামের বার আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬১.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here