আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন (রহ:) জিবনী

188
আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন (রহ:) মাজার গেইট
সুফি সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন (রহ:) মাজার গেইট

মোঃ নজরুল ইসলাম .লেখক ও গবেষকঃ

“আওলাদে রাসুল হযরত শাহ সুফি সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন (রহ:)-জিবনী”

হযরত শাহ সুফি সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন একজন বুজুর্গ ও ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন অলি আল্লাহ ছিলেন। প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুফি সৈয়দ মারুফ শাহ ও সৈয়দ বখতেয়ার মাহিসাওয়ার এর বংশধর সৈয়দ আউলিয়া। তাঁর বংশে শাহ সুফি আল্লামা সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন ১৮৮৭ সালে এক শুভক্ষনে জন্ম গ্রহণ করেন। আল্লামা সৈয়দ সেরাজউদ্দিনের জন্মস্থান ছিল আধার মানিকের সৈয়দ আউলিয়ার বাড়িতে এবং তার পিতার নাম ছিল সৈয়দ খোশাম উদ্দিন। তিনি প্রখর কাশফ ও কারামত সম্পন্ন অতি উচ্চ মার্গের অলিয়ে কামেল ছিলেন বলে আল্লামা আজিজুল হক শেরে বাংলা তার ‘‘দেওয়ানে আজীজ’’ ফারসী কসিদা গ্রন্থে তার অনেক প্রশংসা করেছেন এবং পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন পরিষদ তার সম্মানার্থে এল.জি.ই.ডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দীর্ঘ তিন মাইলের একটি সড়কের নামকরণ করেন ‘‘হযরত শাহ সুফি আল্লামা ছৈয়দ ছেরাজ উদ্দিন সড়ক’’।

বাল্যশিক্ষা শেষে স্থানীয় মাদ্রাসায় যথাযথ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পর তিনি কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে কোরআন, হাদিস, ইসলামি আইনশাস্ত্র ইত্যাদিতে প্রভুত জ্ঞান অর্জন করে শরীয়তের বিধানাবলী শিক্ষার পর পশ্চিম বঙ্গের প্রখ্যাত সুফি আল্লামা আবদুল লতিফ শাহ এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন তার পীরের খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। স্বীয় পীর তার রুহানী অবস্থা অবলোকন পূর্বক তাকে খেলাফত প্রদান করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, আল্লামা সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানীর বংশধর হলেও কাদেরিয়া তরিকায় নিজেকে সম্পৃক্ত না করে চিশতিয়া তরিকায় তাসাউফ সাধনা করেন। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, আল্লামা সৈয়দ সেরাজউদ্দিন নৌপথে এগারবার হজ্বব্রত পালন করেন এবং মদিনা মুনাওয়ারায় রসূলে খোদা (দ.)- এর রওজাপাকে সালাত ও সালাম পেশ করে হযরত (দ.)- এর বংশধর হিসেবে ফয়েজ বরকত ও কামালিয়াত হাসিল করে ধন্য হন। তিনি তাঁর ভাগিনা সুলতানপুর হাজিপাড়ার মাওলানা কলিমুল্লাহ শাহ যখন তিন বছরের শিশু তখন তিনি মাতৃহারা হন। আল্লামা সৈয়দ সেরাজউদ্দিন এর ভাগিনা হিসেবে তাকে আদর সোহাগ করে নিজ বাড়িতে প্রতিপালন করেন এবং প্রাথমিক শিক্ষা মামার বাড়িতে সমাপ্ত করেন।

এরপর স্থানীয় মাদ্রাসায় শিক্ষা শেষে তিনি কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় কোরআন, হাদিস, ফিকহ্, উসুল ও অন্যান্য বিষয়ে দশ বছর পড়াশুনা করে সর্ব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর দেশে ফিরে তাঁর মামা আল্লামা সৈয়দ সেরাজউদ্দিনের সোহবতে গিয়ে নিসবত হাসিল করেন। এ- ছাড়া সৈয়দ সেরাজ উদ্দিনের অপর ভাগিনা উরকিরচরের আল্লামা সৈয়দ আজিজুর রহমান শাহ গাউসুল আজম মাইজভান্ডারি সৈয়দ আহমদ উল্লাহর খলিফা ছিলেন। আধার মানিক গ্রামের অধ্যক্ষ হযরত শাহ সুফি গোলামুর রহমান, অধ্যক্ষ হযরত শাহ সুফি হাফিজুর রহমান ও মগদাই গ্রামের হযরত শাহ সুফি ক্বারী মাওলানা আহমদুর রহমান দীর্ঘদিন তার খেদমত করে তার নিকট হতে শরীয়ত ও তরীকতের জ্ঞানার্জন করেন এবং তার নিকট হতে ফয়েজ ও বরকত লাভে ধন্য হন।

অন্যদিকে মগদাই গ্রামের আশেকে রাসূল (সাঃ), ওস্তাজুল ওলামা, উত্তর গুজরা বায়তুল উলুম সিনিয়র মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ সুফি ক্বারী সৈয়দুল হক দীর্ঘ ৩৩ বছর তার খেদমত করার পর সৈয়দ ছেরাজ উদ্দিন তাকে খেলাফত প্রদান করে ধন্য করেন। সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন সৈয়দ আউলিয়া জামে মসজিদ পুন:নির্মান করেন। আধ্যাতিœক জ্ঞান সাধনায় জনগনকে শিক্ষা দেয়ার জন্য মসজিদ সংলগ্ন খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। সৈয়দ সেরাজ উদ্দিন একজন উচ্চ কারামত সম্পন্ন আউলিয়া ছিলেন। নিচে তার অসংখ্য কারামত হতে

কয়েকটি কারামত উপস্থাপনা করা হলো ঃ
হজরত শাহ্সুফি সৈয়দ সেরাজউদ্দিন (রহঃ) এর দরবারে জনৈক ব্যক্তি পানি পড়া নেয়ার জন্য আসলে হুজুর দূর থেকে তার বোতলে ফু দেন। এতে তিনি মনে করলেন যে তার বোতলে ফু পড়েনি। তাই তিনি বারবার হুজুরকে বোতলে ফু দেয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করলে হুজুর ঐ বোতলে আরেকটি ফু দেয়ার সাথে সাথে বোতলটি ভেঙ্গে মাটিতে পরে যায়। তখন ঐ জনৈক ব্যক্তি আশ্চার্যন্বিত হয়ে হুজুরের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে দোয়া নিয়ে চলে যান।

জনৈক মৌলভীর প্রচন্ড মাথা ব্যথার কথা হুজুরকে জানালে হুজুর তাকে “বিসমিল্লাহ” বলে একটি তাবিজ প্রদান করে মাথায় বেধে রাখার জন্য বলেন। তিনি তাবিজটি মাথায় বাঁধার সাথে সাথে মাথা ব্যথা চলে যায়। এতে তিনি আশ্চার্যন্বিত হন এবং কৌতুহলী হয়ে তাবিজটি খুলে দেখল যে, তাবিজটিতে শুধু ‘‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’’ লেখা আছে। ঐ মৌলবী তাবিজটির ন্যায় অন্য একটি তাবিজ লিখে মাথায় বেধে দিল কিন্তু দেখা গেল যে, তার মাথা ব্যথা পুনরায় শুরু হয়। তিনি হুজুরের নিকট আরেকটি তাবিজ প্রদানের জন্য বললে হুজুর তাকে বলেন আমার মতন তুমিও তো তাবিজ বানাতে পার আমার কাছে কেন এসেছ? একথা শুনে মৌলভী অবাক হল এবং হুজুরের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে সৈয়দ ছেরাজ উদ্দিন তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন এতে দেখা গেল লোকটি সম্পূর্ণ ভাল হয়ে গেল। তার আর কখনো মাথা ব্যথা হয়নি।

পাশর্^বর্তী এলাকার এক চোর সৈয়দ ছেরাজ উদ্দিন এর ঘরে ঢুকে দামী মালামাল সামগ্রী একত্র করে চুরি করার উদ্দেশ্যে তা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। চোর যখন মালামাল হাতে নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে তখন বাহির হতে পারে না, সে তখন চোখে সব কিছু অন্ধকার দেখতে পায়। এভাবে তার সারা রাত কেটে যায়। হুজুর তাহাজ্জুদ নামায শেষে অবগত চোরকে বলে “তুমি জীবনেও আমার এ মালামাল ঘর থেকে বের করতে পারবে না।” তুমি এ সব জিনিসপত্র রেখে আর কখনো চুরি না করার শপথ নিয়ে চলে যাও। লোকটি হুজুরের কথায় অবাক হলেন, তিনি তাকে প্রহার না করে উপদেশ ও কিছু মালামাল দিয়ে চলে যেতে বললেন। চোরটি হযরতের নিকট আর কখনো চুরি না করার শপথ নিয়ে চলে যায়।

আধার মানিকের মনু চৌধুরীর বাড়ীতে এক সময় কোন হাঁস, মুরগী পোষলে তা বন বিড়ালে খেয়ে ফেলত। তারা অতিষ্ট হয়ে হযরতের নিকট তার সমাধান চাইলে হযরত বললেন- বন বিড়াল আসলে বলিও আমি সৈয়দ ছেরাজউদ্দীন তাদের বলেছি তারা যেন আর কখনো এ এলাকায় না আসে এবং কোন গৃহপালিত পশুর ক্ষতি না করে। এ কথা বলার পর থেকে ঐ বাড়ীতে আর কখনো বন বিড়াল দেখা যায়নি।

জাহাজ যোগে একই এলকার অধ্যক্ষ মৌলানা হাফেজুর রমহান সহ একদল হাজী হজ¦ করার জন্য গেলে ঠিক সাগরের মাঝ পথে তুফান শুরু হয়। যাত্রী সকলে ভয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। মৌলানা সৈয়দ ছেরাজ উদ্দিন হাত তুলে আল্লাহ্র নিকট দোয়া করার সাথে সাথে তুফান বন্ধ হয়ে যায়।
রাউজান উপজেলার আধার মানিকের অধ্যক্ষ আল্লামা হাফেজুর রহমান (রহ.) এর পুকুরে দীর্ঘদিন যাবত একটি দুষ্টু জ¦ীন অবস্থান করার কারণে ঐ পুকুরে কেউ গোসল করতে পারত না এমনকি ঐ পুকুরের পানিও ব্যবহার করতে পারত না। এ কথা সৈয়দ ছেরাজ উদ্দিনকে জানালে হুজুর ঐ পুকুরে গিয়ে পুকুর পাড় প্রদক্ষিণ করলে ঐ পুকুর থেকে ঐ দুষ্টু জ¦ীনটি চলে যায়। যাকে ঐ পুকুরে আর কখনো দেখা যায় নি।

হুজুরের ঘরে কৃষি কাজ সম্পন্ন করার জন্য কয়েকজন লোক আসেন এবং তাদের কাজ সম্পন্ন হলে তাদের মুজরী প্রদান করেন। একজন মহিলা ব্যতিত অন্য সবাই তাদের বাড়ী পৌঁছে যায়, এই মহিলা কোন রকমে ঘর থেকে বের হতে পারেনি। তিনি বার বার চেষ্ঠা করেও যখন বাহির হতে পারছিল না, তখন হুজুরকে এ কথা অবহিত করা হলে হজুর তাকে বললেন আমার জন্য ভক্তদের আনা হাদিয়াগুলো রেখে চলে যাও। একথা শুনে উক্ত মহিলা হযরতের নিকট আর কখনো এমন ভুল করবে না বলে ক্ষমা প্রার্থনা করে চলে গেলেন। ১৫ মাঘ ১৯৫৫ সালে তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁকে নিজ বাড়িতে সমাহিত করা হয়। প্রতি বছর ১৫ মার্চ তাঁর ভক্তদের উপস্থিতিতে আধার মানিক দরবারে ছেরাজিয়াতে তাঁর ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়।

সূত্র ঃ
(১) আল্লামা সৈয়দ আজিজুল হক শেরে বাংলা আল-কাদেরী, দিওয়ান-ই- আজিজ (বাংলা সংস্করণ), চট্টগ্রাম, ১৯৬১, পৃ. ৩২৭-৩২৯.
(২) ডি.এস.এম এয়াকুব আলী, চট্টগ্রামের বার আউলিয়া, পৃষ্ঠা: ১৫৯-১৬১.
(৩) সৈয়দ ইসমাইল হোসাইন, রাউজানের ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা: ২২০-২২১.
(৪) গৌরব (গুণীজন সংবর্ধনা), পূর্ব গুজরা ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত (পৃষ্ঠা- ১)

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here